ভীষণ আধুনিক আর সাহসী

একটি সুর যা বাংলাদেশ থেকে
সারা বিশ্বের মানুষকে সংযুক্ত করে

প্রত্যাশা

পরিচালকের কথা

২০১১ সাল থেকে আমি বাংলাদেশে আসছি। বিভিন্ন মৌসুমে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, এখানকার উদ্ভাবন ও উদ্যোগের পাশাপাশি আমাকে সবচেয়ে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি টানে, তা হলো বাংলাদেশের মানুষের কোমল হৃদয়, তাদের সরলতা ও আপন করে নেয়ার ক্ষমতা। এদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে যখন জানতে শুরু করলাম, দেখলাম, এটা খুবই শিল্প সমৃদ্ধ একটি দেশ যেখানে সুর ও গান মানুষের ডিএনএ তে মিশে আছে। এখানকার রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত সবাই হাজারো গান জানেন। সুর ও কবিতা এখানকার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম ও দরিদ্রতর ঘরেও। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই গান গাইতে পারে।

গানের মাধ্যমেই বাংলাদেশের মানুষ মাতৃভূমির প্রতি গভীর টান প্রকাশ করেন। আবার গানের মাধ্যমেই তারা মানুষের মাঝে ঈশ্বরকে খোঁজেন, এই গানই তাদের ডাকে মানবতার পথে। আমি হতবাক, বাংলার মানুষ গানকে রীতিমতো প্রার্থণার মতো করে তুলে দিয়েছেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। এর পাশাপাশি এখানকার মানুষের হৃদয়ে আছে সার্বজনীন মূল্যবোধ আর ভালোবাসা।

কাজেই আমি এখানকার স্থপতি, চিত্রশিল্পী ও সঙ্গীতশিল্পীদের সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম। দেখতে চাইছিলাম, কিভাবে বাংলাদেশের দার্শনিক, কবি ও সংগীতশিল্পীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তারা কাজস করেন। এই খোঁজ করতে গিয়েই আমি রফিক আজম, ঐশী এবং সমাজকর্মী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও বাউল অনুরাগী মনজুরুল হকের কাজ দেখলাম। এসব কাজে আধুনিক ও সাহসী একটা ঐকতান আছে, যা মানুষকে কাছে টানে।

যারা আমাদের এই প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছেন, আমাদের পাশে থেকেছেন, সাহস যুগিয়েছেন, এই চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভেবেছেন, সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

আমরা জনগণের অর্থে (ক্রাউডফান্ড) এই চলচ্চিত্র বানাচ্ছি। কারণ মানুষের ইতিবাচক ঐকতানটাকে সামনে আনতে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর এতে অন্য নির্মাতারাও অণুপ্রাণিত হবে। বাংলাদেশের ভালো গল্পগুলো নিয়ে ভাববে। কারণ, ভালো গল্পই আমাদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে।

ইসাবেলা

ইসাবেলা

গল্প

দ্রুত বর্ধনশীল ও জরাকীর্ণ ঢাকায়, মোট জমির মাত্র পাঁচ শতাংশ পার্ক। যেখানে খেলার মাঠসহ ২৮ শতাংশ খোলা জায়গা থাকা দরকার। আর নিরাপত্তার নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে, বাড়ি বা ভবনের চারপাশে এই শহরের মানুষ বড় বড় দেয়াল তুলেছে, বেড়া দিয়েছে। সবাই এখানে শুধু নিজের কথাই ভাবে, অন্য কারো লাভ ক্ষতির ধার ধারে না। বিশ্বের অন্যান্য জায়গার মানুষও একই সমস্যায় জর্জরিত। টিকে থাকার জন্য রীতিমত লড়াই করতে হচ্ছে সবাইকেই। বিখ্যাত স্থপতি রফিক আযম এখানকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার কাজটি শুরু করেছেন। বর্তমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে উৎসাহিত করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের। তিনি ভালোবাসা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে এই শহরকে সাজাতে চান। তিনি ঢাকার দক্ষিণ অংশে একটি পরিবেশবান্ধব সুন্দর পার্ক গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, যেখানে থাকবে না কোনো দেয়াল, কোনো বিভাজন। যে পার্কে মা-মেয়ে, তরুণ, প্রবীণ, পেশাজীবী সবাই আসতে পারবে। একে অন্যের সাথে দেখা করতে পারবে। কফি শপও থাকবে এই পার্কে, থাকবে গ্রন্থাগার। তাঁর এই পরিকল্পনা কারো কাছে জাদুকরী, কারো জন্য অসুবিধা, অবিশ্বাসীদের জন্য যুৎসই নয়। কিন্তু এটা হচ্ছে!

শহরের অন্যপ্রান্তে ২১ বছরের ঐশী মেডিকেল কলেজে পড়ে, আর গান গায়। লেখাপড়া ও গান দুটোই তার স্বপ্ন। চিকিৎসক হয়ে সে মানুষকে বাঁচার অণুপ্রেরণা দিতে চায়, আবার লোক সঙ্গীত দিয়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে পরিচিত করতে চায় বিশ্ব দরবারে, যা আজো জীবন্ত। তার বাবা মা তাকে ছেলে অথবা মেয়ে হিসেবে নয় বরং মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ঐশী লালন ও লোকসঙ্গীতই বেশি গায়। এই একই গান স্থপতিকেও অণুপ্রাণিত করে। সব সমালোচনা অগ্রাহ্য করে নিজস্ব ঢঙে-সুরে বাউল গানের চর্চা করে ঐশী। তার দাবি, এ গান তাকে প্রেরণা ও শান্তি দেয়, হৃদয়ে অণুরণন তোলে।

তারা কেউ কাউকে চেনেন না। অথচ তাদের অনুপ্রেরণার উৎস আর সম্পর্কটা একই শেকড়ে। তাদের একজন দৃশ্যমান দেয়াল ভাঙায় মগ্ন, অন্যজন ভাঙছেন অদৃশ্য দেয়াল।

নতুন খোলা পার্ক মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, নইলে আগে তাদের দেখাই হতো না। এই পার্কেই ঐশীর সাথে দেখা হয় কুষ্টিয়ার ১৯ বছরের বাউল ভক্ত ইলিয়াসের সাথে। এরই মধ্যে এক হাজার গান লিখে ফেলেছে সে।

নির্দেশনা

হাই টিউনস বাংলাদেশ ডিএনএ, ৯০-১০০ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র। এটি পুরোপুরি বাস্তব জীবন নির্ভর। পরিস্থিতি ও চরিত্র সবই বাস্তবিক। তবে বাস্তবতাকে শক্তভাবে উপস্থাপনের তাগিদে কিছু জায়গায় কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করা হবে। চিত্র ধারণের ক্ষেত্রে তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রের ফ্রেম অনুসরণ করা হবে।

প্রযোজনা কর্মসূচি

ঢাকাসহ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দৃশ্য ধারণ করা হবে। এরপর পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ হবে ফ্রান্সের প্যারিসে। আমাদের নীচের সম্ভাব্য কর্মসূচি অনুযায়ী ২০১৯ সালের এপ্রিলে এই চলচ্চিত্রের কাজ শেষ হবে। এরপর মে মাসের কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শন করা হবে চলচ্চিত্রটি।

চলচ্চিত্রের তহবিল
(লাখো মানুষের হৃদয় থেকে দেয়া অর্থ)

ক্রাউড ফান্ডিং এর বিষয়টিতে শুধু অর্থ সংগ্রহের জন্য জোর দেয়া হয়নি। এর মাধ্যমে বিশ্বকে দেখানো যাবে যে, নতুন ধারণার বিশ্বব্যাপী চাহিদা আছে। এমন মানুষও আছেন, যারা আমাদের বিশ্বকে একসাথে এগিয়ে নিতে চান।

হাই টিউনস, বাংলাদেশ ডিএনএ দর্শকের কাছে এই উপহার। যারা বিশ্বাস করেন, অন্য এক বিশ্ব সম্ভব। যারা নতুন ধারণাকে সমর্থণ করেন।

বিশ্বের হাজারো মানুষের প্রতীকি অনুদান খুঁজছি আমরা। যারা বিশ্বাস করেন ভালো গল্পগুলোই আমাদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে।

ক্রাউড ফান্ডের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি টিভি চ্যানেল ও চলচ্চিত্রকে প্রভাবিত করবে। বোঝানো হবে, মানবতার অনুপ্রেরণামূলক গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রেরও সত্যিকারের চাহিদা আছে।

তহবিলের অতিরিক্ত অর্থ চলচ্চিত্রটির প্রচারণা ও বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানোর কাজে খরচ করা হবে। এর বাইরেও আমরা দর্শকের প্রতিক্রিয়া নেবো। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এই চলচ্চিত্র দেখানোর জন্য উৎসাহিত করা হবে। মানুষের সাথে এ নিয়ে আলোচনাও হবে। আমরা এমন এক গোষ্ঠী তৈরি করতে চাই, যাদের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরো অনেক হাই টিউন তুলে আনবো বিশ্বের বিভিন্ন প্রাণ্ত থেকে। এটা মানুষকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করবে।

আমরা আর্থিক ও কার্যকর অংশীদারদের স্বাগত জানাই। আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন এই ঠিকানায় hightunes.thefilm@gmail.com

চলচ্চিত্র প্রকল্প

অ্যাওয়ার্ড জয়ী তথ্যচিত্র হ্যাপি রেইন দেখিয়েছে, বন্যার পানি কাজে লাগিয়ে লাভজনক মাছ চাষ করে কিভাবে বাংলাদেশের হাজারো কৃষকের জীবন পাল্টে গেছে। ফলে বন্যার মতো বিপর্যয় পরিণত হয়েছিলো সৌভাগ্যের সোনার কাঠিতে। এবার ইসাবেলের নতুন চলচ্চিত্র হাই টিউনস বাংলাদেশ ডিএনএ হতে পারে মানুষে মানুষে সংযোগের নতুন কণ্ঠস্বর। বিশ্বকেও নতুন করে এ বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করবে।

পার্ক নির্মাণ, লালন সংগীত সংরক্ষণ, ও মানবধর্ম প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি, হাই টিউনস বাংলাদেশ ডিএনএ দেখানোর চেষ্টা করেছে ভয় ও অসহিষ্ণুতা কীভাবে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। পাশাপাশি সবাইকে মনে করিয়ে দেয়, উদারতাই প্রতিরোধের শ্রেষ্ঠ উপায়।

নিবিড় অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে, এই চলচ্চিত্রে বাউল গানের ভূমিকা দেখানো হবে। এই সুর ধর্ম এ রাজনীতির উর্ধ্বে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে স্বস্তি দেবে এই সুর। সব অশুভ ঠেলে, আনবে উৎকর্ষ ও স্থিতিশীলতা। নিয়ে যাবে এক অবারিত স্বাধীনতার কাছে।

প্রকৃতি আর সৌন্দর্যে ভরপুর এই চলচ্চিত্র। ফলে দর্শকের মধ্যেও শুভ চিন্তা জাগ্রত হবে। লালনের গানের মতোই সুচিন্তার উদয় হবে তাদের ভেতর। তারা প্রভাবিত হবেন। লালন যেমন দেহকে খাঁচা আর আত্মাকে পাখির সাথে তুলনা করেছেন। ঠিক তেমন হাই টিউনস বাংলাদেশ ডিএনএ মানুষকে কেন্দ্রে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংস্কৃতির শক্তিই এই চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য। হাই টিউনস: বাংলাদেশ ডিএনএ বাংলাদেশের আধ্যাত্মিকতা, মানবতা ও বাংলাদেশের মানুষের উদারতার গল্পই তুলে ধরবে। মৌলবাদ হটানোর শান্তিপূর্ণ শক্তিশালী পথের দিশা দেবে মানুষকে। শেষ পর্যন্ত এই চলচ্চিত্র একটা প্রশ্ন তুলবে যে আমাদের স্বপ্ন কি। আমরা কী বিভাজন চাই নাকি শান্তি ?

হাই টিউনস, বাংলাদেশ ডিএনএ তরুণ প্রজন্মকে এক গভীর বুদ্ধিমত্তার সন্ধান দেবে। আর সংবেদনশীল দর্শকদ, যারা ঠুনকো সমালোচনা বা প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চান।যারা বিদ্যমান দ্বন্দ্বগুলো খতিয়ে দেখতে চান। ভাবতে চান প্রচলিত চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে তাদের জন্যও এটা বড়ো সুযোগ।

এই চলচ্চিত্রটি টেলিভিশন ও সিনেমা হলে দেখানোর পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বের বিপুল সংখ্যক দর্শকের জন্যই এই সিনেমা নির্মিত। বাংলা-ইংরেজি সংস্করনের পাশাপাশি ফরাসি, কোরিয়ান, জাপানি, চীনা, বাহাসা ইন্দোনেশিয়া, ফারসি ও আরবি সংস্করণও বানানো হবে। যাতে বাংলাদেশের মতো অন্যান্য হাই টিউনও প্রতিধ্বিনিত করা যায়।

ঢাকার নির্ধারিত পার্কগুলোর কাজ শেষ হওয়ার ওপরই আসলে নির্ভর করছে, আমাদের চলচ্চিত্রের কাজ কবে শেষ হবে। তবে আমরা আশা করছি, ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ কাজ শেষ করতে পারব।

পটভূমি সম্পর্কে কিছু কথা

বাউল নামের এই রহস্যময় চারণ কবিদের বাস বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কখনো তারা গ্রামের অদূরে বাস করে, কখনো আবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ জমিতে কাজ করে, কেউ করে অন্য কাজ। এদের কেউ আবার একতারা, দোতারা বা ডুবকি বাজিয়ে গান করেই জীবিকা নির্বাহ করে।

বাউল প্রচলিত ধারাবিরোধী একটি আন্দোলন, যা বাংলাদেশের অন্যান্য ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। হিন্দু, বৌদ্ধ, বাংলা সংস্কৃতি, বৈষ্ণব, ও সুফি ইসলাম দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত বাউল ধারা। তারপরও বাউল স্বতন্ত্র। বাউলরা মানব সাধনার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার নীতিতে বিশ্বাসী। তাদের আলাদা কোনো ধর্মীয় আচার নেই, নেই কোনো উপাসনালয়, কোনো ধর্মীয় সংগঠনও নেই তাদের। তাদের বিশ্বাস মানব দেহেই লুকিয়ে আছেন ঈশ্বর। তারা তাদের সুন্দর কবিতা, গান, যন্ত্রসংগীত ও নাচের জন্য সমাদৃত। এর মাধ্যমেই তারা আত্মিক মুক্তির পথ বাতলান। পনেরো শতকে বাংলা সাহিত্যে প্রথম স্থান পায় বাউলদের ভক্তিমূলক গান। সেই থেকেই আলোচনায় আসেন বাউলরা। বাউল গান সুর-তাল-লয় হিন্দু ধর্মের ভক্তি ও সুফিবাদের একটি শাখা দ্বারা প্রভাবিত। যুগের পর যুগ ধরে বাউল গান মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে। অনেক আধ্যাত্মিক নেতা শিষ্যদের শৃঙ্খলা শেখানোর কাজে ব্যবহার করে থাকেন এই সংগীত। ক্রমশই এই গানের ভাষা আধুনিক হয়ে উঠছে। এখন গুণগতমানেও বিকশিত হচ্ছে এই ধারা।

উনবিংশ ও বিংশ শতকের শুরুর দিকে উৎকর্ষতার শীর্ষে ছিলো বাউল আন্দোলন। এখন আবার বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে বাউল সংগীত। বাউলদের গান ও জীবনাচার বাংলা সংস্কৃতির বড় একটি অংশকে প্রভাবিত করেছে, বিশেষ করে নোবেল জয়ী সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান। বর্তমানে আধুনিক ও গতানুগতিক বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রনে বাউল সংগীত এদেশের সংগীত শিল্পের বড় একটি জায়গা দখল করে আছে।

এখনো বাংলাদেশের আনাচে কানাচে আলো ছড়াচ্ছেন বাউলরা। সমৃদ্ধ করে চলেছেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক সংগীতকে। বাউল শিল্পীদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা এখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে, গানের কথায় পরিবর্তন এনে সুর-তাল পাল্টে দিয়েছেন আমূল। আবার আরেক দল আছে যারা চিরাচরিত বাউল চর্চা করেন। তবে তাদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল।

বাউলদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরই নির্ভর করে বাউল গানের টিকে থাকার বিষয়টি। কারণ, বাউলরা সবসময়ই অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত।

এ্ররই মধ্যে বাউল গানের বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি অংশ। প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা, সেমিনার, সভা, উৎসব ও চলচ্চিত্রের মতো নানা কাজের মধ্য দিয়ে তারা বাউলবাদের মূল বিষয় তুলে ধরা এবং বাউল ঐতিহ্য ও দর্শন সংরক্ষণ করতে চান। তারা বাউল চর্চা ও গানের আসল রূপ, ১৯ শতকের বাঙালি দার্শনিক লালন ফকিরের বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তারা বাউল আন্দোলনকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার ব্যপারেও সোচ্চার, যার মূল কথা মানব ধর্ম।

একটা বিষয় নিশ্চিত। ঐতিহ্য বেঁচে আছে। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া বাউলবাদ এখনো প্রাসঙ্গিক। তাই এ নিয়ে লেখা হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে। লালন ফকিরের মত আর কেউ কখনো বাংলাদেশের মানুষকে মানবতার জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করেননি। তিনি একটা যোগসূত্র তৈরি করে গেছেন। যা এখনো সেই শিকড়কে বাঁচিয়ে রেখেছে।

মানবতাবাদ

ল্যাটিন শব্দ হিউম্যানিটাস থেকে এসেছে মানবতা শব্দটি

অর্থ মানব প্রেম, মানুষের প্রতি অনুরাগ। মানবীয় শিক্ষার মাধ্যমে মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়া।

ল্যাটিন থেকে ১৯ দশকে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে শব্দটি

একই সময়ের একটি বাংলা গানও একই বার্তা

‘‘দেখে শুনে হয় না রুচি,
যমে তো কাউকে ছাড়বে না’’

‘‘ব্রাহ্মণ ও শুদ্র সবাইতো একই জলে তৈরি। তারা তো একই রকম শুদ্ধ ও পবিত্র। তবে সমাজে তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকবে কেনো ?

২০০৫ সালে বাউল গানকে মানবতার মৌখিক ও অমূল্য ঐতিহ্য বলে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা ইউনেস্কো। এই গান মানবতার আহ্বান।

‘‘যে যা ভাবে সেই রূপ সে হয়, রাম-রহিম-কারিম-কালা এক আত্মা জগৎময়’’

‘‘যে ঈশ্বরকে যেভাবে ডাকে, সে রূপেই সে দেখা দেয়, যিনি রাম, তিনি রহিম, কারিম, কালা।’’

বাউল সংগীতের টান এত প্রবর যে এখনো তা বাংলাদেশের মানুষকে একইভাবে সম্মোহিত করে রেখেছে। অথচ কত কত বছর আগে গানগুলো সৃষ্টি হয়েছে।

‘আদম বলো কোন নুরে হয় মা হাওয়া কি সেই নুরে নাই...’

আদম যদি আলো থেকে তৈরি হন, আর হাওয়ার জন্ম যদি হয় আদম থেকে, তাহলে তারা তো একই। হাওয়া একজন মাও। কাজেই হাওয়ার মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তার শক্তি আর ভালোবাসা বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়েছে।

শত বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এই গানগুলো যে এখনো গাওয়া হচ্ছে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিচালক সম্পর্কিত তথ্য

প্যারিসের সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংস্কৃতিক ভূগোল ও উন্নয়ন বিষয়ে পিএইচডিধারী ইসাবেলা আনটুনেস আফ্রিকা ও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে উন্নয়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।

অসাধারণ ও বিচিত্র পারিপার্শ্বিকতা ইসাবেলার চিন্তা ও উন্নয়নমূলক কাজ করার পন্থাকে পরিপুষ্ট করেছে। জেলে, রাখাল, কৃষক থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা, ধনিক শ্রেনী, সরকারি কর্মকর্তা ও উন্নয়নমূলখ দাতা সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের সাথে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে তিনি প্রামান্য চিত্র লেখেন ও পরিচালনা করেন, যা পূর্বকল্পিত ধারনাগুলোর বাইরে গিয়ে বিতর্ক তৈরির মাধ্যমে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

ইসাবেলা বিশ্বাস করেন, মানুষের কর্মশক্তি একটি নবায়নযোগ্য সম্পদ। আমরা সাধারনত নবায়নযোগ্য শক্তিকে বিকল্প শক্তি বলি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে সবচেয়ে দামী ও অব্যবহৃত শক্তি হলো মানবিক শক্তি। ভেবে দেখুন, আপনি কত কি করতে পারেন, যখন আপনি অনুপ্রাণিত, সুখী ও ভালোবাসা বোধ করেন।

মানবিক শক্তির ওপর ভর করেই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার নতুন পন্থা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ইসাবেলা। বড় ধরণের পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদ সৃষ্টি ও নতুন ব্যবসা কিংবা কর্মস্থান বা ভালো কিছু সৃষ্টির জন্য মানুষকে শক্তি যোগাতে চান তিনি। বর্তমানে তিনি লা ফাব্রিক দু জেওগ্রাফে নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চালু করছেন। তাঁর উদ্দেশ্য হলো সমাধানের সঙ্গে মানুষ ও আত্মার সংযোগ স্থাপন।

www.isabelleantunes.com